Search This Blog

Tuesday, February 21, 2017

আটই ফাল্গুণ তেরোশো আটান্ন সাল


শার্টটা ইস্ত্রি করে রেখেছি, পরশু ইন্টারভিউ'র দিন পড়ে যেও- মামীর কথা অমান্য করা দিনটা ঠিক মনে নেই, তবে তারিখটা ছিলো আটই ফাল্গুন, তেরোশো উনষাট।


প্রথম ভাষা শহীদ



বাবা আপনার খুব দুঃখ ছিলো, আপনার ছেলে প্রথম হতে পারেনি কোনদিন। আপনার সকল বন্ধুদের ছেলেরা জীবনে কোনো না কোনদিন প্রথম হয়েছিলো। এ ব্যর্থতা বয়ে নিয়ে গ্যাছেন জীবনের শেষ মূহুর্তেও। আপনারা আমার লাশটাও দেখতে পারেন নি, কবরটাও না। এরচেয়ে বড় দুঃখের কিছু কি আছে?


বাবা মনে আছে বাবুবাজারের প্রেসটা বন্ধ করেই দুদিন আগে, ১৯ই ফেব্রুয়ারি আমি মানিকগঞ্জ গিয়ে দেখা করে আসি আপনার সাথে, আমি বোঝাতে পারলাম না এই ছাব্বিশের যৌবন আগুন পলাশের যৌবন, বিয়ে করবার যৌবন নয়। আপনার মেয়ে ঠিক করে রেখেছেন কিন্তু বাবা পাকিস্তান সরকার আমাদের উপর চাপিয়ে দেয় যে রাষ্ট্রভাষা উর্দু সেটা মেনে নিয়ে আমি বিয়ের পিড়িতে বসতে পারিনা। তাই লুকিয়ে ঢাকা চলে আসি ২০ তারিখ।

একুশ তারিখ সকাল থেকেই উত্তেজনা, ছাত্রছাত্রীরা জমা হচ্ছে, ভাঙা হবে ১৪৪.... সামনে পুলিশ তো কি হয়েছে, সামনে কামান তো কি হয়েছে। বাঙালী, বাংলা ভাষার এতটা মরিয়া হতে পারে জানা ছিলোনা।

বেলা তিনটা সাত, হঠাত পুলিশ গুলি ছুড়তে থাকে টিয়ার শেল উড়তে থাকে। বাবা একজন পড়ে গ্যালো। আমি ধরতে দৌড়াচ্ছি, গ্যাস চোখ মুখ জ্বালাচ্ছে আমি তুলে নিয়ে হাতে হাত দৌড়াচ্ছি। ঠা ঠা ঠা শব্দে আমি লুটিয়ে পড়লাম, আমার মাথায় রাইফেলের গুলি ঢুকে উড়িয়ে নিয়ে যায় খুলি। বাবা ভীষন যন্ত্রনায় দেখতে পেলাম ডঃ মশাররফুর খানের হাতে ছিটকে পড়া আমার মগজ, আমি পড়ে থাকি মেডিকেল হোষ্টেলের ১৭ নং রুমের পুর্বপাশে। আমার লাশ ধরাধরি করে রাখা হয় এনাটমি হলের বারান্দায়।

বাবা জানেন গুলিটা একটু সুযোগ দেয়নি মৃত্যুর আগে যে বলব -

আমি রফিকউদ্দিন,  একটু আগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেডিকেল কলেজ ব্যারাকে ফিরছিলাম। ছাত্র জনতার উপর পুলিশের হঠাত নারকীয় হামলায় রাস্তায় পড়ে থাকা একজনকে তুলে নিয়ে।"

আমি আরও বলতে চেয়েছিলাম ঘটনা ঘটার বারো ঘন্টা পর- 

আমার বাবাকে বলবেন আমি ভাষার জন্য, আমাদের বর্ণমালার জন্য শহীদ হয়েছি। আমার রক্তেভেজা শার্ট নিয়ে গ্যাছে তরুন, আগামীকাল মিছিলে ঝোলাবে বলে। আমি রফিকউদ্দিন আহমেদ, বাবা আবদুল লতিফ, অরক্ষিত অঞ্চলে কবর দেয়ায় চিন্হীত করা যায়নি আমার কবর,আমার বাবাকে বলবেন ম্যাজিস্ট্রেট ওবায়দুল্লাহ জানে আমাকে কোথায় চিন্হহীন দাফন করেছে সরকার? 

বাবাকে বলবেন আমি আজ প্রথম হয়েছি।  আমি ভাষার দাবীতে মিছিলের প্রথম মূখ, আমিই প্রথম শহীদ। হাত মুঠে যে মিছিলে শ্লোগান ধরেছিলাম " বাংলা চাই, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।" 

মৃত্যুর দিন আটই ফাল্গুন তেরোশো আটান্ন সেদিন আমার বয়স ছিলো ছাব্বিশ। বাবাকে বলবেন তার ছেলে প্রথমবার প্রথম হয়েছে, তার ছেলে ভাষার দাবীতে করা মিছিলে, আঘাত হানা হানাদারের বুলেটবিদ্ধ প্রথম শহীদ।


শহীদ রফিকউদ্দিন।।  ২১শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২

Featured Post

দ্যাখা অদ্যাখা কাব্য ১-৩

দ্যাখা – অদ্যাখা কাব্যঃ  ১ আমি চাই তোমার সাথে কোথাও কখনোই আমার দেখা না হউক, আমি চাই, প্রানপনে চাই। তাই এড়িয়ে যাই, তোমার হাটা পথ...